কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ এ ০১:৫৬ PM
কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: ফল প্রকাশের তারিখ: ০৯-০৩-২০২৬
উদ্ভিদতত্ত্ব: জারা লেবু Rutaceae পরিবারভুক্ত Citrus জাতীয় ফলের একটিরিৎ, দ্রুতবর্ধনশীল, ঝোপালো স্বভাবের ক্ষুদ্র বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। এটি দীর্ঘজীবী, মাঝারি থেকে অত্যাধিক শাখা সমৃদ্ধ বৃক্ষ। পাতা বড়, উপবৃত্তাকার, পত্রফলকের অগ্রভাগ গোলাকৃতি ও গাঢ় সবুজ বর্ণের। ফুল সাদা, ছোট, পুরুষ ও উভয়লিঙ্গিক, পাঁচ (৫) পাপড়ি বিশিষ্ট। অনেকগুলো ফুল সাইম সাদৃশ্য পুষ্প মঞ্জুরীতে সাজানো থাকে। ফুলে ৫টি বৃত্যাংশ বিদ্যমান। ফলে বীজ বিদ্যমান। ফলে ১০ থেকে ৩৫টি বীজ থাকে। বীজ সাধারণত সূচালো ও গোলাকার। ফল তুলনামূলকভাবে বড় (গড়ে ৮৫০ গ্রাম সর্বোচ্চ ৩ কেজি) ও লম্বাকৃতির, ফলত্বক অসমান, বিশেষ সুগন্ধযুক্ত। সালাদ বা আচার হিসেবে এ জাতীয় লেবুর পুরু খোসা ভক্ষণযোগ্য ও তীতাবিহীন। ফলত্বক হতে মূল্যবান সুগন্ধী তেল আহরণ করা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrus media.
বাংলাদেশের গ্রীষ্ম ও অবগ্রীষ্ম মণ্ডলীয় আবহাওয়া লেবু জাতীয় ফল চাষের জন্য উপযোগী। জারা লেবু বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় ফল। এ অঞ্চল থেকে প্রতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রচুর পরিমাণ জারা লেবু রপ্তানি হয়ে থাকে। এ জাতটি ঔষধি গুণসম্পন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে ফলের প্রায় ৮০% ভক্ষণযোগ্য, এতে ৭৭% পানি, ক্রুড প্রোটিন ৭.৫%, স্টার্চ ২৩%, অ্যাশ ৩.৭৮%,পিএইচ ৩.৫, টিএসএস ৬%। এতে উপস্থিত প্রধান জৈব যৌগগুলি হলো আইসো লিমোনিন, সিট্রাল, ফ্লাভানন, ভিটামিন-সি, পেকটিন, লিনাল, ডেকানাল এবং ন্যানানাল যা বেশ কিছু শারীরিকসমস্যায় উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। পেকটিন এবং স্টার্চ খাদ্য তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর বিভিন্ন জৈব যৌগগুলি ঠান্ডাজনিত সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রকৃচ্ছতা, ছত্রাক, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। এতে যে এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে তা বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে। বিশ্বজুড়ে সিট্রন কার্বনেটেড পানীয়, সিরাপ, জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ সহ অন্যান্য মূল্যবান পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
জলবায়ু ও মাটিঃ সুনিষ্কাশিত দোআঁশ থেকে বেলে দোআঁশ সম্পন্ন মধ্যম অম্লীয় মাটিতে লেবু ভাল জন্মে। পাহাড়ি, উঁচু ও সমতল উভয় এলাকাতেই লেবু জন্মে। লেবু ১৫০০ মিটার পর্যন্ত উঁচু পাহাড়ে চাষ করা যায়। লেবু সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু পছন্দ করে। সাধারণত ২৫০ থেকে ৩০০ সে. তাপমাত্রায় এদের দৈহিক বৃদ্ধি সবচেয়ে ভাল হয়, ১৩০ সে. এর নীচে এবং ৪০০ সে. এর উপরে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে জারা লেবু চাষ হলেও খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ও ঢাকাসহ সারা দেশে এ লেবু চাষাবাদের পর্যাপ্ত সুযোগ বিদ্যমান।
বংশ বিস্তারঃ লেবুজাতীয় ফলে অঙ্গজ বংশবিস্তার পদ্ধতি বহুল প্রচলিত। সাধারণত কাটিং এবং গুটি কলম পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা হয়।
জমি তৈরিঃ জমি তৈরির পূর্বে জমি হতে আগাছা ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় গাছপালা অপসারণ করতে হবে। সমতল ভূমিতে আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে কোদালের সাহায্যে জমি তৈরি করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের ঢালে সিঁড়ি (ধাপ) তৈরি করে চারা লাগাতে হবে। সিঁড়ি তৈরি করা সম্ভব না হলে পাহাড়ের ঢালে নির্দিষ্ট দূরত্বে গোলাকার বা অর্ধচন্দ্রাকৃতি আকারের বেড তৈরি করে গাছ লাগানো যেতে পারে। সমতল ভূমিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করতে হবে।
মাদা তৈরিঃ চারা রেপণের জন্য ৩×৩ মিটার দূরত্বে ৬০×৬০×৬০ সে.মি.মাপের গর্ত করে প্রতি গর্তে ১৫ কেজি কম্পোস্ট বা পঁচা গোবর, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২০০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ এবং ১.০ কেজি ডলোচুন (অম্লীয় মাটির জন্য) এবং ৩০ গ্রাম বোরিক এসিড গর্তের উপরের অর্ধেক মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। গর্ত ভরাট করার ১০-১৫ দিন পর চারা রোপণ করতে হবে।
চারা রোপণের সময়ঃ বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ মে মাসে জারা লেবুর চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে সেচ-নিষ্কাশের সুব্যবস্থা থাকলে অতিরিক্ত খরা ও বর্ষার সময় ব্যতিত বছরের বাকি সময়ও চারা লাগানো যায়।
চারা রোপণের দূরত্বঃ সাধারণ বর্গাকার বা আয়তাকার পদ্ধতিতে লাগাতে হয়। সারি হতে সারির এবং গাছ হতে গাছের দূরত্ব ৩ মিটার রাখা ভালো। তবে মাটির উর্বরতা, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে রোপণ দূরত্ব কম বা বেশি হতে পারে।
চারা রোপণ ও পরবর্তী পরিচর্যাঃ মাদা তৈরির ১০-১৫ দিন পর চারা লাগাতে হয়। চারা লাগানের সময় খুব সাবধানে গোড়ার টব/ পলিব্যাগ অপসারণ করতে হবে যাতে মাটির বলটি ভেঙ্গে না যায়। চারা এমনভাবে লাগাতে হবে যাতে এর গোড়া সোজা থাকে এবং মাটির বলটি মাদার উপরের পৃষ্ঠ বরাবর থাকে। এরপর হাত দ্বারা মাটি চেপে দিতে হবে। চারাটি যাতে হেলে না যায় এবং এর গোড়া যাতে বাতাসে নড়াচড়া করতে না পারে সেজন্য চারা লাগানোর পরপরই খুঁটি দিতে হবে। খুঁটিটি সোজা করে পুঁতে এর সাথে শক্ত করে পাটের সুতলী দিয়ে চারাটি এমনভাবে বাঁধতে হবে যাতে চারা এবং খুঁটির মাঝে সামান্য দূরত্ব থাকে। গরু ছাগলের উপদ্রবের আশঙ্কা থাকলে, সম্পূর্ণ বাগানে অথবা প্রত্যেক গাছে বেড়া দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। লাগানোর পরপরই প্রতিটি চারায় পানি সেচ দিতে হবে। চারা রোপণের পর প্রথমে সপ্তাহে প্রতিদিন এবং এর পরবর্তী এক মাস ২-৩ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। চারা লাগানোর পর চারার কান্ডে চুনের প্রলেপ দিতে হবে যেন সরাসরি সূর্যালোকে কান্ডে বাকলের ক্ষতি না হয়।
সার প্রয়োগ: গাছের যথাযথ বৃদ্ধির জন্য সময়মত, সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। লেবু জাতীয় ফলের জন্য প্রতি বছর ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমপি) সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রয়োগকৃত সারের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে।
বয়স ভেদে গাছ প্রতি সারের পরিমাণ নিম্নে দেওয়া হলোঃ
গাছের বয়স (বছর) | গোবর (কেজি) | ইউরিয়া (গ্রাম) | টিএসপি (গ্রাম) | এমওপি (গ্রাম) | জিপসাম (গ্রাম) | জিঙ্ক (গ্রাম) | বোরণ (গ্রাম)
|
১-২ | ২৫ | ২৫০ | ২৫০ | ২৫০ | ১০০ | ২৫ | ৫০ |
৩-৫ | ৩০ | ৫০০ | ৪০০ | ৪০০ | ১৫০ | ৩০ | ৬০ |
৫ এর অধিক | ৪০ | ৭৫০ | ৬০০ | ৬০০ | ২০০ | ৪০ | ৭৫ |
বি.দ্র. মাটির প্রকার ও উর্বরতার উপর ভিত্তি করে সারের পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে।
পচা গোবর এবং সম্পূর্ণ সার সমান ৩ ভাগ করে গাছের গোড়া হতে ৩০-৮০ সে.মি.দূরে নালা (Furrow) করে বা গাছের ডালপালা যে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার নীচের জমি কোদাল দিয়ে হালকা করে কুপিয়ে মাটির সাথে ভাল করে মিশিয়ে ফল সেটিং এর সময় অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এক ভাগ, একভাগ বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত বয়স্ক ফল গাছের গোড়ায়প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত বয়স্ক ফল গাছের গোড়ার চতুর্দিকে ৩০ সে.মি.এলাকায় কোন খাদ্য গ্রহণকারী শিকড় না থাকায় সেই স্থানের সার প্রয়োগ করা উচিত নয়। নাইট্রোজেন, পটাশ ও ফসফরাস ছাড়াও জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, কপার ও বোরন জাতীয় খাদ্যোপাদান লেবু জাতীয় ফল গাছের জন্য অত্যাবশ্যক। মাঠে প্রায়শই এসব খাদ্যোপাদানের অভাবে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। সাধারণত এসব খাদ্যোপাদান মাটিতে না প্রয়োগ করে পানিতে মিশিয়ে পাতায় প্রয়োগ করা উত্তম।
পানি সেচ ও নিষ্কাশন: আবহাওয়া ও মাটির ধরনের উপর সেচের মাত্রা ও পরিমাণ নির্ভরশীল। অতিরিক্ত খরায় সেচ না দিলে লেবু জাতীয় ফলের খাদ্য গ্রহণকারী শিকড় ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। গাছ লাগানোর প্রথম বছর প্রতি সপ্তাহে একবার সেচ দিতে হবে। পক্ষান্তরে ফলন্ত গাছে ১৫ দিন অন্তর একবার সেচ দিতে হবে। সর্বোপারি কতদিন পর পর সেচ দিতে হবে তা নির্ভর করে মাটির বুনট ও বৃষ্টিপাতের উপর। ফল পরিপক্ক হওয়ার সময় সেচ দিলে ফলের আকার বড় ও রসের পরিমাণ বেড়ে যায়। লেবু জাতীয় ফলের বাগানে সাধারণত ফ্লাড, ডবল রিং, বেসিন, নালা ও ড্রিপ পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া হয়ে থাকে। তবে ডাবল রিং পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া উত্তম। এতে গাছের গোড়ায় পানি জমে না এবং মাটি বাহিত রোগের প্রকোপ কম হয়। পাহাড়ি এলাকায় ড্রিপ ও স্প্রিং কলার পদ্ধতিতে সেচ দিতে হয়। সমতল এলাকাতেও এ পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা যায়। ড্রিপ পদ্ধতিতে সেচ দিলে ৫০% পানি সাশ্রয় হয়। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
আগাছা পরিষ্কার ও মালচিং: লেবু জাতীয় ফলের বাগান সবসময় আগাছামুক্ত রাখা দরকার যাতে গাছ মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান সহজে নিতে পারে। তবে গভীরভাবে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে বা চাষ দিয়ে আগাছা দমন করা উচিৎ নয়। এতে গাছের শিকড় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। বর্ষা মৌসুমে দা দিয়ে কেটে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। আগাছানাশক যেমন, গ্যামেক্সন ও ডাইউরন (১.৫ কেজি/ হে: ও ২.৫ কেজি/হে:) একত্রে মিশিয়েও আগাছা দমন করা যায়। উল্লেখ্য যে, গাছের গোড়ার চতুর্দিকে ও সেচ নালায় আগাছানাশক প্রয়োগ করা ঠিক নয়। আগাছানাশক গাছের পাতায় লাগালে পাতা ঝলসে যায় বিধায় আগাছানাশক প্রয়োগকারীকে সতর্ক থাকতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে রস সংরক্ষণ এবং আগাছা দমনের জন্য খড়, কচুরিপানা ও শুকনা পাতা দিয়ে গাছের গোড়ার মাটি ৪-৫ ইঞ্চি পুরু করে ঢেকে দেওয়াকে মালচিং বলে। মালচিং করলে সেচ কম লাগে। মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ হয় এবং সর্বোপরি ফলন বাড়ে ও ফলের গুণগতমান উন্নত হয়।
প্রুনিং ও ট্রেনিং (অংগ ছাঁটাই): বয়স্ক গাছের কান্ড ও ডালপালার অংশবিশেষ কেটে অপসারণ করাকে প্রুনিং বলে। অল্প বয়স্ক চারা গাছ ছাঁটাই করে সুনির্দিষ্ট দৈহিক কাঠামো প্রদান করাকে ট্রেনিং বলে। চারায় ডালপালা না হয়ে প্রধান কান্ড ওপরের দিকে বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত উচ্চতায় গাছের ডগা কেটে দিতে হবে। এছাড়া গাছ বেশী ঝোপালো হলে অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করে গাছের আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। লেবু জাতীয় ফলের চারা গাছে অতিরিক্ত প্রুনিং করা ঠিক নয়; কারণ এতে ফল আসতে দেরী হয়। গাছ লাগানোর ২-৩ বছরের মধ্যে প্রুনিং করার দরকার নেই। তখন শুধু কান্ড থেকে কুঁড়ি বের হলে ভেঙ্গে দিতে হবে। কান্ডের ২-৩ ফুটের মধ্যে কোন ডাল রাখা ঠিক নয়। এ উচ্চতায় ডাল থাকলে গাছের পরিচর্যা করতে অসুবিধা হয়। তাছাড়া ওয়াটার সাকার দেখামাত্রই কেটে দিতে হবে। বয়স্ক ওয়াটার সাকার কাটলে গাছের ক্ষতি হতে পারে। তাই বয়স্ক ওয়াটার সাকার কাটা ঠিক নয়। এই ওয়াটার সাকার নির্দিষ্ট সময় পর ফল দিয়ে থাকে। একবারে অতিরিক্ত প্রুনিং না করে অল্প অল্প করে করা উত্তম। শীতের শেষ ভাগ ছাঁটাই এর উপযুক্ত সময়। ছোট কুঁড়ি নখ দিয়েই অপসারণ করা যায। শক্ত ডাল ধারালো সিকেচার দিয়ে ছাঁটাই করতে হবে। দা দিয়ে ছাঁটাই করলে ডাল ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই দা দিয়ে ছাঁটাই করা ঠিক নয়। ছাঁটাই করার পর কর্তিত অংশে বর্দোপেষ্ট/ আলকাতরা এর প্রলেপ দিতে হবে। নচেৎ কাটা অংশ দিয়ে রোগজীবাণু ও কান্ড ছিদ্র করা পোকা গাছে প্রবেশ করে। এজন্য দুটি মাটির পাত্রে আলাদাভাবে ৭০ গ্রাম তুঁতে ও ১৪০ গ্রাম চুন ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে বর্দোপেষ্ট তৈরি করতে হয়।
আন্তঃফসল: বাগানে লেবু জাতীয় ফলের চারা রোপণের পর থেকে ফল ধরার পূর্ব পর্যন্ত আন্তঃফসল করা যেতে পারে। ফল ফসল থেকে ৫০-১০০ সে.মি দূরত্বে লাগাতে হবে। আন্তঃফসল সাধারণত ছোট আকারের, অগভীর শিকড় বিশিষ্ট, স্বল্প মেয়াদী হতে হবে। আন্তঃফসল হিসেবে সবজি যেমন- টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, ঢেঁড়শ, মূলা, কদু, সীম, গাজর, লালশাক ইত্যাদি এবং ডাল ও তৈল জাতীয় ফসল মাষ, মুগ, মসুর, ছোলা, মটর ,বাদাম, এবং ফল হিসাবে পেঁপে, আনারস, ইত্যাদি চাষ করা যায়। বর্ষা মৌসুমে আন্তঃফসল হিসাবে সবুজ সার যেমন ধৈঞ্চা, শনপাট, অড়হড় চাষ করা হয়।
গাছের ফুল/ফল ভাঙ্গন: কলমের গাছ রোপণের পরবর্তী বছর থেকেই মুকুল/ফুল আসতে শুরু করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হারে ফল ও হয়। কিন্তু গাছের বয়স ১-২ বছর না হওয়া পর্যন্ত মুকুল/ ফুল বা কচি ফল ভেঙ্গে দিতে হবে। তবে জাত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য দু’একটি ফল রাখা যেতে পারে।
ফল পাতলাকরণ: গাছে ফল বেশি থাকলে অতি অল্প সময়ে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই দীর্ঘ সময় ধরে প্রতি বছর ফল পেতে হলে কিছু ফল ছাঁটাই করে দেয়া দরকার। ফল পাতলা করলে ফলের আকারও বড় হবে এবং গাছের জীবনকাল বৃদ্ধি পাবে।
ফল সংগ্রহ: লেবু জাতীয় ফল পরিপক্ক হওয়ার সাথে সাথে রং বদলাতে শুরু করে। লেবুর ফল যখন হালকা সবুজ থেকে হলদে রং ধারণ করে এবং চামড়া মসৃণ হয় তখন ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়।
ফল সংরক্ষণ: তাজা ফল হিমাগারে সংরক্ষণ করলে ১০০ সে: তাপমাত্রা ও ৮০-৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় ২ মাস পর্যন্ত এবং ৫.৬০০ সে.তাপমাত্রায় ৩ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তাজা ফল সংগ্রহের পর ১৩ শতাংশ তরল মোমের আবরণ দিয়ে সাধারণ তাপমাত্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র : আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট,
আকবরপুর, মৌলভীবাজার
কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, সিলেট