কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:১৮ PM

কলা চাষ পদ্ধতি

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: সবজি প্রকাশের তারিখ: ১৫-০১-২০২৬

ইংরেজি নামঃ Banana

Scientific Name: Musa spp.

উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ফলের মধ্যে কলা একটি উৎকৃষ্ট ফল। কলা বাংলাদেশের প্রধান ফল, যা সারা বছর পাওয়া যায় এবং সবাই খাওয়ার সুযোগ পায়। বগুড়া, যশোর, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ প্রভৃতি এলাকায় ব্যাপকভাবে কলার চাষ হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে কলার চাষ হয় এবং বার্ষিক মোট উৎপাদন ৮.০৭ লক্ষ মে. টন। কলার হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫.৬০ টন।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার

  • ভিটামিন বি৬, সি এবং পটাশিয়াম সমৃদ্ধ

  • খাদ্যশক্তির চমৎকার উৎস

  • কাঁচা ও পাকা অবস্থায় খাওয়া যায়

কলা ক্যালরি, খাদ্যপ্রাণ, খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ ও সুগন্ধী এবং পুষ্টিকর ফল। ফলন অন্যান্য ফল ও ফসল অপেক্ষা অনেক বেশি।

মাটি

পর্যাপ্ত রোদযুক্ত ও পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা সম্পন্ন উঁচু জমি কলা চাষের জন্য উপযুক্ত। উর্বর দো-আঁশ মাটি কলা চাষের জন্য উত্তম।

জমি ও জলবায়ু

  • উঁচু ও মাঝারি দো-আঁশ জমি ভালো

  • পানি জমে না এমন জমি দরকার

  • গরম ও আর্দ্র জলবায়ু উপযুক্ত

  • আদর্শ তাপমাত্রা: ২০-৩৫°C

জমি তৈরি ও গর্ত খনন

জমি ভালোভাবে গভীর করে চাষ করতে হয়। দেড় থেকে দুই মিটার দূরে দূরে ৬০ x ৬০ x ৬০ সেমি. আকারের গর্ত খনন করতে হয়। চারা রোপণের মাসখানেক আগেই গর্ত খনন করতে হয়। গর্তে গোবর ও টিএসপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত বন্ধ করে রাখতে হবে।

রোপণের সময়

কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমে রোপণ করা যায়।

প্রথম রোপণ: আশ্বিন-কার্তিক (মধ্য-সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য-নভেম্বর)। দ্বিতীয় রোপণ: মাঘ-ফাল্গুন (মধ্য-জানুয়ারি থেকে মধ্য-মার্চ)। তৃতীয় রোপণ: চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য-মার্চ থেকে মধ্য-মে)।

কলার জাত

বাংলাদেশে কলার বিভিন্ন জাত রয়েছে, যা স্বাদ, আকৃতি এবং ফলনের দিক থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। কিছু জনপ্রিয় কলার জাতের মধ্যে রয়েছে: সাগর কলা, অমৃতসাগর, সবরি, কবরী, চম্পা, চিনিচাম্পা, দুধসর, এবং কাঁচকলা। এ ছাড়া, G9 (গ্র্যান্ড নাইন) নামে একটি উচ্চফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী জাতও রয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশে চাষ করা হচ্ছে।

কলার জাতগুলোকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • বীজবিহীন কলা

এগুলোর মধ্যে সবরি, অমৃতসাগর, অগ্নিশ্বর, দুধসর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

  • কিছুটা বীজযুক্ত কলা

যেমন- চম্পা, চিনিচাম্পা, কবরী, চন্দন কবরী ইত্যাদি।

  • বীজযুক্ত কলা

যেমন, এটেকলা, বতুর আইটা, গোমা, সাংগী আইটা ইত্যাদি।

নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা চলছে এবং বারি কর্তৃক আবিষ্কৃত কিছু উন্নত জাত যেমন বারি কলা-১, বারি কলা-২, এবং বারি কলা-৩, বারি কলা-৪, বারি কলা-৫ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কিছু স্থানীয় জাতের মধ্যে রয়েছে: আনাজি কলা, মেহের সাগর ইত্যাদি।

কলার বিভিন্ন জাতের মধ্যে স্বাদ, গঠন, এবং ফলনের তারতম্য দেখা যায়, যা চাষিদের এবং ভোক্তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন জাতের কলা নির্বাচন করতে সাহায্য করে।

চারা রোপণ

রোপণের জন্য অসি তেউড় (Sword Sucker) উত্তম। অসি তেউড়ের পাতা সরু, সুচালো। অনেকটা তলোয়ারের মত, গুড়ি বড় ও শক্তিশালী এবং কান্ড ক্রমশ গোড়া থেকে উপরের দিকে সরু হয়। তিন মাস বয়স্ক সুস্থ সবল তেউড় রোগমুক্ত বাগান থেকে সংগ্রহ করতে হয়। সাধারণত খাটো জাতের গাছের ৩৫-৪৫ সেমি. ও লম্বা জাতের গাছের ৫০-৬০ সেমি. দৈর্ঘ্যরে তেউড় ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া টিস্যু কালচার চারা ব্যবহার করা হলে বাড়তি কিছু সুবিধা পাওয়া যায়।

কলা গাছে সার প্রয়োগ

চারা রোপণের পর গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত সার প্রয়োগ করা আবশ্যক। বয়স ভিত্তিতে গাছপ্রতি সারের পরিমাণ নিম্নে দেখানো হলো। প্রয়োগ পদ্ধতি: সম্পূর্ণ পরিমাণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড এবং অর্ধেক এমওপি সার গর্ত তৈরির সময় মাটির সাথে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও বাকি অর্ধেক এমওপি সার চারা রোপণের ২ মাস পর থেকে ২ মাস পর পর ৩ বারে এবং ফুল আসার পর আরও একবার গাছের চতুর্দিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। সার দেয়ার সময় জমি হালকাভাবে কোপাতে হবে যাতে শিকড় কেটে না যায়। জমির আর্দ্রতা কম থাকলে সার দেয়ার পর পানি সেচ দেয়া একান্ত প্রয়োজন।

সারের নাম

গাছ প্রতি সারের পরিমাণ

গোবর

১০ কেজি

ইউরিয়া

৫০০ গ্রাম

টিএসপি

৪০০ গ্রাম

এমওপি

৬০০ গ্রাম

জিপসাম

২০০ গ্রাম

জিংক সালফেট

১.৫ গ্রাম

বরিক এসিড

২.০ গ্রাম

ফল ফসল পরিচর্যা

চারা রোপণের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে তখনই সেচ দেওয়া উচিত। এ ছাড়া, শুষ্ক মৌসুমে ১৫-২০ দিন অন্তর সেচ দেওয়া দরকার। বর্ষার সময় কলা বাগানে যাতে পানি জমতে না পারে তার জন্য নালা থাকা আবশ্যক। মোচা আসার পূর্ব পর্যন্ত গাছের গোড়ায় কোন তেউড় রাখা উচিত নয়। মোচা আসার পর গাছপ্রতি মাত্র একটি তেউড় বাড়তে দেয়া ভাল।

ফসল সংগ্রহ

ঋতুভেদে রোপণের ১০-১৩ মাসের মধ্যে সাধারণত সব জাতের কলাই পরিপক্ব হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করলে কলার গায়ের শিরাগুলো তিন-চতুর্থাংশ পুরো হলেই কাটতে হয়। তাছাড়াও কলার অগ্রভাগের পুষ্পাংশ শুকিয়ে গেলে বুঝতে হবে কলা পুষ্ট হয়েছে। সাধারণত মোচা আসার পর ফল পুষ্ট হতে ২.৫- ৪ মাস সময় লাগে। কলা কাটানোর পর কাঁদি শক্ত জায়গায় বা মাটিতে রাখলে কলার গায়ে কালো দাগ পড়ে এবং কলা পাকার সময় দাগওয়ালা অংশ তাড়াতাড়ি পচে যায়।

সংরক্ষণ

  • কাঁচা অবস্থায় সংগ্রহ করে পাকিয়ে বাজারজাত করা হয়।

  • ঠাণ্ডা ও শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কলার রোগ ও পোকা মাকড় ব্যবস্থাপনা

কলার পানামা রোগ ব্যবস্থাপনা

এটি একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক রোগ। এ রোগের আক্রমণে প্রথমে বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে যায় এবং পরে কচি পাতাও হলুদ রং ধারণ করে। পরবর্তী সময় পাতা বোঁটার কাছে ভেঙ্গে গাছের চতুর্দিকে ঝুলে থাকে এবং মরে যায়। কিন্তু সবচেয়ে কচি পাতাটি গাছের মাথায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অবশেষে গাছ মরে যায়। কোন কোন সময় গাছ লম্বালম্বিভাবে ফেটেও যায়। অভ্যন্তরীণ লক্ষণ হিসেবে ভাসকুলার বান্ডেল হলদে-বাদামি রং ধারণ করে।

প্রতিকার

 আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

 আক্রান্ত গাছের তেউড় রোপণ করা যাবে না।

 রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে।

 আক্রান্ত জমিতে ৩-৪ বছর কলা চাষ করা যাবে না।

কলার সিগাটোকা রোগ ব্যবস্থাপনা

এ রোগের আক্রমণে প্রাথমিকভাবে ৩য় বা ৪র্থ পাতায় ছোট ছোট হলুদ দাগ দেখা যায়। ক্রমশ দাগগুলো বড় হয় ও বাদামী রং ধারণ করে। এভাবে একাধিক দাগ মিলে বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং তখন পাতা পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়।

প্রতিকার

 আক্রান্ত পাতা কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

 প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি টিল্ট ২৫০ ইসি অথবা ১ গ্রাম অটোস্টিন মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর গাছে স্প্রে করতে হবে।

কলার বানচি-টপ ভাইরাস রোগ ব্যবস্থাপনা

এ রোগের আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি হ্রাস পায় এবং পাতা গুচ্ছাকারে বের হয়। পাতা আকারে খাটো, অপ্রশস্ত এবং উপরের দিকে খাড়া থাকে। কচি পাতার কিনারা উপরের দিকে বাঁকানো এবং সামান্য হলুদ রঙের হয়। অনেক সময় পাতার মধ্য শিরা ও বোঁটায় ঘন সবুজ দাগ দেখা যায়। পাতার শিরার মধ্যে ঘন সবুজ দাগ পড়ে।

প্রতিকার

 আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

 জীবাণু বহনকারী ‘জাব পোকা’ কীটনাশক যেমন: ম্যালাথিওন ২ মি.লি. ১ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে দমন করতে হবে।

কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা

কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা কলার কচি পাতায় হাটাহাটি করে এবং সবুজ অংশ নষ্ট করে। ফলে সেখানে অসংখ্য দাগের সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত আক্রমণে গাছ দুর্বল হয়ে যায়। কলা বের হওয়ার সময় হলে পোকা মোচার মধ্যে ঢুকে কচি কলার ওপর হাঁটাহাঁটি করে এবং রস চুষে খায়। ফলে কলার গায়ে বসন্ত রোগের দাগের মতো দাগ হয়। এসব দাগের কারণে কলার বাজারমূল্য কমে যায়।

প্রতিকার

 পোকা-আক্রান্ত মাঠে বার বার কলা চাষ করা যাবে না।

 কলার মোচা বের হওয়ার সময় ছিদ্রবিশিষ্ট পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

 প্রতি ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২ বার গাছের পাতার উপরে ছিটাতে হবে।

ম্যালাথিয়ন বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি বা লিবাসিড ৫০ ইসি ২ মিলি হারে ব্যবহার করতে হবে।

কৃষকের জন্য পরামর্শ

রোগমুক্ত ও সুস্থ চারা ব্যবহার করুন।
প্রতিটি গাছে বেশি চারা রাখতে দিবেন না।
থোকা বেঁধে গেলে বেশি পাতলা না রাখুন।
মাঝে মাঝে জমি পরিষ্কার রাখুন।

কলা একটি লাভজনক এবং কম খরচে বেশি আয় করা যায় এমন ফল। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রতি গাছে ১২০-১৮০ টাকা পর্যন্ত লাভ সম্ভব। সঠিক জাত, সময়মতো সেচ, সার ও রোগ দমনের মাধ্যমে উচ্চফলন নিশ্চিত করা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ

  • কৃষি প্রযুক্তি হাতবই (১০ম সংস্করণ)

  • জাতীয় কৃষি বাতায়ন

  • কৃষি প্রযুক্তি ভান্ডার

  • কৃষি তথ্য ভান্ডার (Agro Knowledge Bank)

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন