কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০৬:০৩ PM

আখ

কন্টেন্ট: ই-কৃষি ই-কৃষি বিভাগ: অর্থকরী প্রকাশের তারিখ: ১৬-০২-২০২৬

আখ বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। আজকাল পাট চাষের চেয়ে আখ চাষ অধিক লাভজনক বলে চাষীরা পাটের চেয়ে আখ চাষেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই কিছু না কিছু আখের চাষ হয়, তবে জলবায়ুর প্রভাব অনুযায়ী দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো আখ চাষের জন্য উপযোগী।

উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

আখ পরিবারভুক্ত ঘাস জাতীয় ১ দণ্ডাকৃতির ডাল পালাহীন একবর্ষ বা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ।

গাছের পাতা কিছুটা ভুট্টার পাতার ন্যায় তবে অধিকতর শক্ত ও খাড়া, সুচালো ও কিনারা ধারযুক্ত।

আখদন্ড উচ্চতায় ১.৮৫-৩.৭২ মিটার পর্যন্ত এমনকি ৯.৩ মিটার পর্যন্ত হয়। দন্ডের কোনোটি নরম এবং কোনোটি

শক্ত, তবে সব দন্ডই গিটযুক্ত।

আখ দণ্ডের কোনোটির হালকা, বেগুনি, কোনোটি সবুজ ও কোনোটি হলদে সবুজ রংয়ের হয়ে থাকে।

সকল জাতের আখ গাছেই ফুল হয় না, যেসব জাতে হয় সেগুলোতে গাছের আগায় কাশফুলে মতো সাদা ধবধবে ফুলের শীষ বের হয় ফলে খুব ছোট ধরনের বীজ ধরে সেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না।

প্রয়োজনের তুলনায় বাংলাদেশে চিনির উৎপাদন খুবই কম। এর প্রধান কারণ আখের হেক্টর প্রতি উৎপাদন ও মিলে চিনির উৎপাদন হার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম৷ অধিক উৎপাদনশীল আখের জাতের অভাবও আর একটি কারণ। অন্যান্য কারণ হলো উপযুক্ত সময়ের আগে বা পরে আখ কাটা, আখ মাটিতে পড়ে ও শুকিয়ে যাওয়া, চিনিকলে পৌঁছাতে বা গ্রহণ করতে করতে আখ শুকিয়ে যাওয়া এবং কোনো কোনা সময় কারখানার কারিগরি ভুলত্রুটি ইত্যাদি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু আখ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ সকল অসুবিধা কাটিয়ে উঠে আধুনিক তথা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে ১৩৫-১৩৬ টন আখ অনায়াসেই উৎপন্ন হতে পারে। একইভাবে বলা যায়, চিনিকলের কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার উন্নতি সাধন হলে দেশে চিনি উৎপাদনের যথেষ্ট অগ্রগতি হবে।

আখের জাত

বিএসআরআই আখ ৪১

  • জাতটি উচ্চ চিনি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন (পোল ১২.১২%)
  • উচ্চ ফলনশীল (গড় ফলন ১৩৯.৫৫টন/হে.)
  • চিবিয়ে ও রস করে খাওয়ার উপযোগী
  • মধ্যম পরিপক্ব
  • উচ্চমানসম্পন্ন গুড় তৈরির জন্য ভাল
  • লালপচা রোগ ও খরা সহিষ্ণু

বিএসআরআই আখ ৪২ (রংক্তিলাশ)

  • জাতটি উচ্চ চিনি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন (পোল ১১.১১%)
  • উচ্চ ফলনশীল (গড় ফলন ১৫৯.৫৭ টন/হে.)
  • চিবিয়ে ও রস করে খাওয়ার উপযোগী
  • মধ্যম পরিপক্ব
  • উচ্চ মানসম্পন্ন গুড় তৈরির জন্য ভাল
  • খরা সহিষ্ণু

বিএসআরআই আখ ৪৩

  • জাতটি উচ্চ চিনি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন (পোল ১৩.৭২%)
  • উচ্চ ফলনশীল (গড় ফলন ১১৮.৩৬ টন/হে.)
  • আগাম পরিপক্ব
  • মুড়ি আখের জন্য ভালো
  • উচ্চ মানসম্পন্ন গুড় তৈরির জন্য ভাল
  • লালপচা রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা সম্পন্ন
  • খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু

বিএসআরআই আখ ৪৪

  • এট একটি কম আঁশ সমৃদ্ধ জাত
  • জাতটি উচ্চ চিনি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন (পোল ১৩.৩৫%)
  • উচ্চফলনশীল (গড় ফলন ১০৬.৯১ টন/হে.)
  • আগাম পরিপক্ব
  • উচ্চ মানসম্পন্ন গুড় তৈরির জন্য ভাল
  • লালপচা রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা সম্পন্ন
  • খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু

বিএসআরআই আখ ৪৫

  • ফলন ১০০-১০৫ টন/হে.
  • জাতটি উচ্চ চিনি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন (পোল ১৩.৮৮%)
  • আগাম পরিপক্ব
  • খরা, বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততা সহিষ্ণু
  • মুড়ি আখের জন্য ভালো
  • উচ্চ মানসম্পন্ন গুড় তৈরির জন্য ভাল
  • লালপচা ও স্মাট রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা সম্পন্ন

বিএসআরআই আখ ৪৬

  • বন্যা এবং জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু
  • উচ্চ ফলনশীল (গড় ফলন ১০৩ টন/হে., সর্বোচ্চ ফলন ১১৯ টন/হে.)
  • উচ্চ চিনি ধারণ ক্ষমতা (চিনি ধারণ ক্ষমতা ১১.৪২-১৪.৬১%, গড় ১২.৯১%)
  • মুড়ি আখ চাষের জন্য উপযোগী
  • লালপচা ও পাইনএ্যাপল রোগ প্রতিরোধী

আখের চাষাবাদ পদ্ধতি

চাষের উপযুক্ততা

চাষের মৌসুম: অক্টোবর-এপ্রিল (কার্তিক-চৈত্র) এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রোপণ করা যায়। তবে আগাম রোপণই উত্তম, কারণ এই সময়ে রোপণ করলে-

আখ যথেষ্ট বৃদ্ধি হওয়ার সুযোগ পায়,

আখের অঙ্কুরোদগম ঠিকমত হয়, এবং

আখের সাথে সাথি ফসল চাষ করা যেতে পারে

উপযুক্ত জলবায়ু

আখের জন্য গ্রীষ্ম ও অবগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু উপযোগ। বেশি গরম ও ঠাণ্ডা উভয়েই আখের জন্য ক্ষতিকর। বাস্তবিকপক্ষে গড়পড়তা দৈনিক ২৫ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা আখ চাষের জন্য সর্বোত্তম। (আখের বৃদ্ধি ৩১ সে. তাপমাত্রার বেশি এবং ১১ সে. এর নিচে ক্ষতিগ্রস্ত হয়)। মাঝারি ধরণের বৃষ্টিপাত অর্থ্যাৎ ১৭৮০-২০৩০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত আখ চাষের জন্য ভালো। ৬০ ইঞ্চি অর্থ্যাৎ ১৫২০ সেন্টিমিটার এর কম বৃষ্টি ভালো নয়। তবে সেচের সাহায্যে ৬৩০-৭৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এমন অঞ্চলেও আখ জন্মানো যায়।

মাটির ধরণ

এঁটেল, দোঁ-আশ ও এঁটেল দোঁ-আশ মাটিতে আখ ভালো জন্মে। গভীর পলিমাটিতেও আখ ভালো উৎপন্ন হয়। বেলে ও ইট পাটকেলযুক্ত মাটিতে আখ মোটেই ভালো হয় না। আখের জমি উঁচু ও সমতল হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেসব নিচু জমিতে সহজেই পানি জমে যায় এবং পানির নিঃসরণ ভালো হয় না সেসব জমি আখ চাষের উপযোগী নয়।


চাষের জন্য উপযুক্ত অঞ্চল

বাংলাদেশের প্রতি জেলাতেই কিছু না কিছু আখের চাষ হয়, তবে জলবায়ুর প্রভাব অনুযায়ী দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো আখ চাষের জন্য উপযোগী। তাই দেখা যায় রাজশাহী, রংপুর দিনাজপুর, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় প্রচুর আখ জন্মে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো মধ্যে ফরিদপুর, ঢাকা ও জামালপুরেও আখের আবাদ ভালো হতে দেখা যাচ্ছে।

জমি তৈরি পদ্ধতি

আখের জমি ৩/৪ বার চাষ ও বার কয়েক মই দিয়ে প্রস্তুত করতে হয়৷ জমি ততো সূক্ষ্মভাবে/ খুব মিহি করে চাষ করার প্রয়োজন হয় না৷ পূর্ববতী ফসল আখ হলে সে ফসলের গোড়া জমি হতে উঠিয়ে অন্যত্র ফেলে দিতে হবে৷ যেহেতু আখের জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন সেজন্য সমস্ত জমিকে ৫০ ফুট ১৫.১ মিটার প্রশস্ত ও ১০০-২০০ ফুট ৩১-৬২ মিটার দৈর্ঘ্য ফালিত ভাগ করে নিলে নিষ্কাশনের জন্য নালা কাটা সুবিধাজনক হয়৷

আখ চাষের জন্য জমি দুই পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা যায়, যথা-

সমতল বা ভাওর পদ্ধিত

এ পদ্ধতিতে ফালি ফালি জমিতে লাঙ্গল দিয়ে ৪৫.৫-৬১ সেন্টিমিটার দূরে দূরে ভাওর করা হয় । তারপর সে ভাওরে আখের টুকরা (sett) বপন করা হয়। তবে এ পদ্ধতির বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। যে কারণে আমাদের দেশে হেক্টর প্রতি আখের ফলন কম হয়। দেশি লাঙ্গলের সাহায্যে “ভাওর” করা হয় বলে গভীরতা খুব একটা হয় না এবং সব জায়গায় সমান হয় না। ফলে লাগানো পর বীজ -আখ প্রায়ই জমির উপর ভেসে থাকতে দেখা যায়। উপরন্তু চৈত্র-বৈশাখ মাসের খরার ফলে মাটিতে রসের অভাবে অনেক সংখ্যক বীজ আখের টুকরা হতে চারা গজাতে পারে না। চারার শিকড় আবার মাটির বেশ উপরিভাগে থাকে বিধায় ঝড়-বৃষ্টির দাপেট সহজেই লুটিয়ে পড়ে।

নালা বা পরীক্ষা পদ্ধতি

এ পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত। এ পদ্ধতিতে ফালি জমিতে ১ মিটার দূরে দূরে নালা কাটতে হয়। ভাওর পদ্ধতিতে আখ চাষের যে সমস্ত অসুবিধা আছে নালা পদ্ধতিতে সেগুলোর অনেকটাই থাকে না। জমির উপরিভাগ শুষ্ক হয়ে গেলেও নালাতে বেশ রস থাকে, ফলে বীজ হতে চারা গাজানো সহজ হয়। তদুপরি সার, পানি গাছের গোড়ায় পৌঁছানো সুবিধাজনক। প্রতিটি নালার মাপ হবে উপর বা মুখ ৩১ সেন্টিমিটার প্রশস্ত নিচ বা তলা ২৩ সেন্টিমিটার প্রশস্ত এবং লম্বায় ৩১-৬২ মিটার। নালা আস্তে আস্তে মাটি দ্বারা ভরাট হওয়ার ফলে গাছের গোড়া খুব দৃঢ়ভাবে মাটিতে আটেক থাকে। ফলে ঝড় বা বাতাসে আখ সহজে মাটিতে পড়ে যায় না। অধিকন্তু এই পদ্ধতিতে মুড়ি আখ ভালোভাবে জণ্মানো যায়।

বীজ বপন পূর্বে করণীয়

বীজ নির্বাচন ও সংগ্রহ: আখের বীজ বলতে আখের ছোট ছোট টুকরাকেই বোঝায়। যে আখ ফসলে রোগ পোকার আক্রমণ ও ভিন্ন জাতের মিশ্রণ নেই সে যেন ফসল হতেই বীজ সংগ্রহ করা শ্রেয়। একটি আখ দণ্ডের দিক হতে বীজ সংগ্রহ করা ভালো, কারণ আগার দিকের বীজ হতেই ভলো চারা গজায়। তাই আগের দিনে চাষীরা শুধু আখের আগা হইতে একটি মাত্র চারা বা বীজ সংগ্রহ করতেন। আসলে নিচের দিকের কিছু অংশ বাদ দিয়ে সমস্ত আখটাই বীজ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তাই পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে সম্পূর্ণ আখটাই নালায় লম্বালম্বি ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। বীজের জন্য কোনো ক্ষেতের আখ নির্বাচন করার পর সেখান হতে বীজ সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি আখ ধারালো দা এর সাহায্যে টুকরা টুকরা করতে হয়। প্রতি টুকরাতে তিনটি করে চোখ থাকতে হবে।

বীজ শোধন

আখের বীজ জমিতে লাগাবার আগে শোধন করা একান্ত প্রয়োজন। তাতে বীজ ছাড়া ছত্রাক ও অন্যান্য জীবাণুর আক্রমণ হতে রক্ষা পেয়ে সুষ্ঠুরূপে অঙ্কুরিত হতে পারে। অন্যথায় বীজ লাল পঁচা, স্মাট, রাস্ট প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ায় অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হয় এবং চারাগাছ আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। বীজ শোধনের জন্য যেসব ঔষধ পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে এরেটান-৬ ও এগালল উল্লেখযোগ্য। আধাসের এরেটান-৬ দুই মণ বিশ সের পরিষ্কার পানিতে ভালো করে মিশিয়ে দিয়ে তাতে বীজের দুই কাটা প্রায় ডুবিয়ে নিতে হয়। এগালল আধাসের পরিমাণ ১ মণ ১০ সের পরিষ্কার পানিতে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মিশ্রিত পানিতে ৫ মিনিটকাল বীজ ডুবিয়ে রেখে জমিতে লাগাতে হবে। অধুনা টেকেটা বা ব্যাভিস্টিন নামক ঔষধ দ্বারা বীজ শোধন করা হয়।

বীজ বপন

বীজ বপন পদ্ধতি: কার্তিক-অগ্রহায়ণ হতে শুরু করে ফাল্গুন-চৈত্র মাস পর্যন্ত আখ বপন করা যায়। তবে প্রথমোক্ত সময়টিই শ্রেয়। নালায় বা ভাওরে কয়েক পদ্ধতিতে বীজ লাগানো যায়। মাটির রস, বীজের অবস্থা ও পরিমাণের উপর নির্ভর করে কোনো এক পদ্ধতিতে বীজ বপন করতে হয়। বীজ নিম্নবর্ণিত কয়েকটি পদ্ধতিতে বপন করা যায়:


মাথায় মাথায় বপন পদ্ধতি: এই নিয়মে একটি বীজ বা টুকরার মাথা অপর একটি টুকরার মাথার কাছাকাছি রেখে বহন করতে হয়।

আঁকাবাঁকা পদ্ধতি: এই নিয়মে একটি বীজের মাথা অপর আরেকটি বীজের মাথার সঙ্গে বাঁকা অর্থ্যাৎ কোনো পরে লাগাতে হয়।

দেড়া পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে দুটি টুকরা মাথা মাথায় (১ম পদ্ধতির মতো লাগানোর পর একটি টুকরা সেই দুই মাথা বরাবর সমান্তরাল করে লাগান হয়। অবশ্য এ প্রথায় নালায় দু সারিতে বীজ বপন করতে হয়।

সমান্তরাল পদ্ধতি: এই নিয়মে প্রথম পন্থাটির ন্যায় এক সারির স্থলে দুই সারি বীজ পাশাপাশি সমান্তরাল করে বপন করতে হয়।

উপরে বর্ণিত যে পন্থা বা পদ্ধতিতেই বীজ বপন করা হোক না কেন তার প্রধান উদ্দেশ্য জমিতে যেন বীজের অঙ্কুরোদগম আশানুরূপ হয়৷ সেজন্য পদ্ধতিগত সুবিধা যাই থাকুক না কেন সব চাইতে বড় কথা হলো নালার মাটিতে বীজ বপন করার পর বীজের চোখ যে মাটি স্পর্শ করে থাকতে হবে। সঠিকভাবে বীজ লাগাবার পর ২/৩ ইঞ্চি অর্থাৎ ৫-৭.৫০ সেন্টিমিটার মাটি দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে।

বীজের হার

একর প্রতি ২০-৪০ অর্থাৎ হেক্টর প্রতি ৩.৭৫-৪.৭৫ টন বীজ লাগে। এক নালা থেকে অন্য নালার দূরত্ব ১.২৫ মি.হলে প্রতি হেক্টরে ৩০০০০টি এবং দূরত্ব ১ মিটার হলে ৩৭৫০০টি তিন বিশিষ্ট বীজ অর্থ্যাৎ আখের টুকরা লাগবে। অবশ্য নালায় বীজ বপনের পদ্ধতি বিভিন্ন হলে বীজের হারে কিছুটা তারতম্য হবে। রোপা আখ চাষে বীজের পরিমাণ প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে অনেক কম লাগে, যেমন প্রতি হেক্টরে ১.৯ টন বীজ।

সেচ ব্যবস্থাপনা

যদি বীজ বপনের পর দেখা যায় যে ১০/১৫ দিনের মধ্যেও অঙ্কুর বের হচ্ছে না তা হলে হালকা ধরনের সেচ দেওয়া ভালো। আখ চাষিরা সাধারণত আখ ফসলে পানি সেচ দেয় না। কিন্তু উত্তম ফলনের জন্য জমিতে সেচ দেওয়া অত্যাবশ্যক। আখ দীর্ঘস্থায়ী ফসল, প্রায় এক বৎসরকাল তা মাঠে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্তত দুটি সময়ে পানি ফসলটির জন্য পানি বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়। প্রথমবার জমিতে বীজ বপন ও চারার প্রাথমিক বৃদ্ধির সময় এবং দ্বিতীয়বার কার্তিক মাসে যখন বৃষ্টির অভাবে জমির রস দ্রুত কমতে থাকে তখন। সুতরাং আখের ভালো ফলনের জন্য কমপক্ষে দু’বার এবং প্রয়োজনবোধে ততোধিক বার সেচ দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

আগাছা দমন ও মাটি আলগা করা

আখের জমিতে প্রচুর পরিমাণে আগাছা জন্মে। সময়মতো তা নিধন করা প্রয়োজন। দুই থেকে তিনবার আগাছা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হতে পারে। সে সাথে নালার মাটি নরম করে দিতে হয়। সেচ বা বৃষ্টির পর রৌদে নালার মাটির উপরিভাগে শক্ত আবরণের সৃষ্টি হতে পারে। এতে চারা গজানো ও এর বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে নিড়ানির সাহায্যে সেই আবরণ ভেঙ্গে দিয়ে মাটি নরম করে দিতে হয়।

অন্যান্য পরিচর্যা

গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়া : আখের গোড়ায় মাটি দেওয়া অত্যাবশ্যক। চারার উচ্চতা যখন ২-৩ ফুট অর্থাৎ ৬০-ঌ০ সেন্টিমিটার হয় তখনই প্রথমবারের মতো মাটি দিতে হয়। দুই সারির মাঝখানে যে মাটি জমা থাকে সেই মাটিই গোড়ায় দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। ইউরিয়া ও সরিষার খৈল প্রয়োগ করার পরেই গোড়ায় মাটি দেওয়ার কাজটি করতে হয়। আখের জমিতে সাথী ফসল থাকলে সেই ফসলটি উঠানোর পরই এই মাটি দেওয়ার কাজটি সমাধান করতে হয়। দ্বিতীয়বার গোড়ায় মাটি দিতে হয় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে। এই সময় শেষ বারের মতো ইউরিয়া সারটুকু প্রয়োগ করতে হয়। শেষবারের মতো মাটি দেওয়ার ফলে আখের ক্ষেত্রে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে দুই সারির মাঝখানে যেখানে মাটি উঁচু হয়েছিল সেইস্থলে নিচু নালার সৃষ্টি হয়েছে আর আখের গোড়ার জমি বেশ উঁচু হয়ে উঠেছে। বর্ষাকালীন পানি এই নালাপথে সহজেই নিষ্কাশিত হয় আর গাছের গোড়া শক্ত হওয়ার ফলে ঝড়-ঝাপটায় সহজেই লুটিয়ে পড়ে না।

আখের জমি একটু নিচু বা অসমান হলে বর্ষার সময় ক্ষেতে পানি জমে যাবার সম্ভাবনা থাকে। নিষ্কাশনের সুবন্দোবস্ত করে বৃষ্টি অথবা সেচের অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে। নচেত আখের বৃদ্ধি স্থগিত হয়ে যাবে, নানা প্রকার রোগ দেখা দিবে এবং চিনি ও গুড়ের উৎপাদন কমে যাবে।

আখের ঝোপে অনেক দিন পর্যন্ত কুশি বের হয়। পরিপক্ক কুশির আখ কাটার সময় অল্প বয়স্ক অর্থাৎ‌ অপরিপক্ক কুশির আখ এক সঙ্গে কেটে মাড়াই করলে তা হতে নিম্নমানের রস ও চিনি উৎপন্ন হয়। সেইজন্য ২/৩ মাস পরে যে সমস্ত কুশি বের হয় সেগুলো কেটে ফেলা উচিত।

আখের বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার

খোল পঁচা রোগ

লক্ষণ

  • আখের নিচের পাতায় কালচে লাল থেকে লাল রঙ্গের দাগ দেখা যায়।
  • পরবর্তীতে পাতার নিচে পঁচন শুরু হয় এবং টান দিলে উঠে আসে।
  • খোলের নিচে ছত্রাকের কাল গুটি গুটি অংশ দেখতে পাওয়া যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • রোগমুক্ত আনূমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • আগাম চাষ করা আগাম চাষ অনুসরণ করা।
  • আখ কাটার পর পরিত্যক্ত অংশ ঐ জমিতেই পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের চাষ বন্ধ করতে হবে।
  • রোগাক্রান্ত গাছ থেকে আক্রান্ত পাতা ও খোল আপসারণ করে মাটিতে পুতে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • জমিতে পানি নিষ্কাশনের সু-ব্যবস্থা নিতে হবে।

আংটি দাগ রোগ

লক্ষণ

  • এটি ছত্রাকজনিত রোগ।
  • এ রোগ হলে আখের পাতায় অসংখ্য দাগ দেখা দেয়।
  • দাগের মাঝখানটা খড়ের ন্যায় কিন্তু কিনারা বাদামি রঙের হয়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • রোগমুক্ত আনূমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • রোগ প্রতিরোধ জাতের চাষ করতে হবে।
  • আখ কাটার পর অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলুন।
  • রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।
  • আক্রান্ত পাতা অপসারণ করে পুড়িয়ে ফেলা।
  • কপারঅক্সিক্লোরাইড ১ গ্রাম/ লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।

মোজাইক রোগ

লক্ষণ

  • গাঢ় সবুজ রং এর পাতা মধ্যে হালকা হালকা ফ্যাকাশে বা হলুদে রং এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছোট ছোট টানা টানা দাগই এ রোগের প্রধান লক্ষণ।
  • তবে ইহা পাতা লম্বলম্বি দিকে সমস্ত পাতা জুড়ে সমভাবে বিস্তৃত থাকে।
  • পুরানো পাতার চেয়ে কচি পাতায় এ রোগের লক্ষণ অধিক পরিস্কার বোঝা যায় এবং কান্ডের উপরিভাগে ছোট ছোট চিঁর ধরে।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি ইক্ষুর চাষ বন্ধ করতে হবে।
  • রোগমুক্ত আনূমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • রোগ প্রতিরোধ জাতের চাষ করতে হবে।
  • জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
  • জমিতে সুষম সার ব্যবহার করা।

চক্ষু দাগ রোগ

লক্ষণ

  • এটি ছত্রাকজনিত রোগ।
  • এ রোগ হলে আখের পাতায় লম্বাটে লালচে বা বাদামি দাগ দেখা দেয়।
  • দাগের মাঝখানটা লালচে বা বাদামী কিন্তু কিনারা খড়ের ন্যায় রঙ্গের হয়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।
  • রোগমুক্ত আনূমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • রোগ প্রতিরোধ জাতের চাষ করতে হবে।
  • আখ কাটার পর অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলুন।
  • আক্রান্ত পাতা অপসারণ করে পুড়িয়ে ফেলা।
  • কপারঅক্সিক্লোরাইড ১ গ্রাম/ লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।

সাদা পাতা রোগ

লক্ষণ

  • আক্রান্ত গাছের পাতা সাদা হয়ে যায়।
  • অনেক সময় অঙ্কুরোদগম এর পরেই কচি পাতা সাদা রং ধারন করে।
  • আক্রান্ত গাছের কুশি হয় বয়স্ক গাছের ডগার মধ্যস্থ পাতাও সাদা হয়।
  • আক্রান্ত গাছের গড়ন খর্বাকৃতির হয়।
  • ঝাড়-বৃদ্ধি খুব কম এবং অধিক কুশি হয়।
  • বয়স্ক আখের চোখ গুলো ফুটে যায় এবং সম্পূর্ণ সাদা বা সবুজ সাদা মিশ্রিত পার্শ্ব কুশি বের হয়।
  • আখের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত আখের ঝাড় থেকে বীজ ব্যবহার করা যাবে না।
  • আগাম আখ চাষ করুন।
  • উন্নত জাতের আখ বপন করুন।
  • সুস্থ সবল রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • ৫৪ সে. তাপমাত্রায় আর্দ্র গরম বাতাসে বীজ ৪ ঘন্টাকাল শোধন করে রোপণ করতে হবে।
  • রোগাক্রান্ত আখের ঝাড় শিকড়সহ তুলে ফেলতে হবে।

কালো শীষ রোগ

লক্ষণ

  • আখের বয়স ৩/৪ মাস থেকেই এ রোগ দেখা দেয়।
  • আক্রান্ত গাছের মাথা কাল চাবুকের মত কয়েক ফুট লম্বা একটা শীষ বের হয়।
  • আক্রান্ত গাছ সাধারণতঃ খর্বাকৃতির হয়ে থাকে।
  • কান্ড পেন্সিলের মত চিকন ও শক্ত হয় এবং বাড়তে পারে না।
  • আক্রান্ত গাছের পাতাগুলো সরু, খাট ও খাড়া হয় এবং হালকা সবুজ রং ধারণ করে।
  • সাধারণতঃ মুড়ি ইক্ষুতে এ রোগের আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হয়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের চাষ বন্ধ করতে হবে।
  • রোগমুক্ত আনূমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
  • আগাম চাষ করা আগাম চাষ অনুসরণ করা।
  • আক্রান্ত গাছের ঝড় শিকড় সমেত তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

সুটিমোল্ড রোগ

লক্ষণ

  • এ রোগের আক্রমণে পাতায় , ফলে ও কান্ডে কাল ময়লা জমে।
  • মিলিবাগ বা সাদা মাছির আক্রমণ এ রোগ ডেকে আনে।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • একই জমিতে পরপর আখ চাষ করবেন না।
  • গভীরভাবে জমি চাষ করুন
  • আগাম চাষ করা আগাম চাষ অনুসরণ করা।
  • আকান্ত পাতা ও ডগা ছাটাই করে ধ্বংস করা।
  • টিল্ট ২৫০ ইসি ১০ লি. পানিতে ৫ মি.লি. মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ২ বার স্প্রে করা।

বীজ পঁচা রোগ Seed Rot of Sugarcane

লক্ষণ

  • জমিতে আখ রোপনের পর তা গজায় না বরং পঁচে যায়।
  • গজালেও তা টিকে না চারা মরে যায়।
  • রোপন করা আখ কাটলে আনারসের মত গন্ধ পাওয়া যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • অনুমোদিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
  • জমিতে যথাযথ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বীজ তলায় চারা তৈরি করে চারা মূল জমিতে রোপণ করুন।
  • আক্রান্ত গাছ জমি থেকে শিকড় সমেত তুলে ফেলুন।
  • রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।
  • অতি ভেজা বা অতি শুকনা জমিতে ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় আখ রোপণ করবেন না।
  • প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে অটোস্টিন বা নোইন নামক ছত্রাক নাশক মিশিয়ে রোপনের আগে ৩০ মিনিট ধরে বীজ শোধন করে নিন।

উইল্ট রোগ (Wilt of Sugarcane)

লক্ষণ

  • আখের বয়স যখন ৮-৯ মাস হলে এ রোগের আক্রমণ দেখা যায়।
  • আক্রান্ত গাছের পাতা নেতিয়ে পড়ে এবং উপর থেকে শুকাতে থাকে।
  • আক্রান্ত আখ লম্বালম্বিভাবে চিড়লে কান্ডের মধ্যভাগে গিরার নিকটে গাঢ় লাল রং দেখা যায়।
  • লাল পচা রোগের মতই উইল্ট রোগে আক্রান্ত আখের গিটের অংশে ইটের ন্যায় লাল হয় কিন্তু এক্ষেত্রে ছোপ সাদা আড়াআড়ি দাগ দেখা যায় না।
  • রোগের প্রকোপ বেশি হলে আক্রান্ত আখের ভিতরে ফাঁপা হয় এবং কান্ড শুকিয়ে যায়।
  • খুব অল্প সময়ের মধ্যে আক্রান্ত জমির আখ শুকিয়ে যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত গাছ জমি থেকে শিকড় সমেত তুলে ফেলুন।
  • রোগাক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।
  • আক্রান্ত জমিতে পরবর্তীতে আখ চাষ না করে অন্য ফসলের আবাদ করা।
  • রোগাক্রান্ত জমিতে আখের মুড়ি চাষ করা যাবে না।
  • অনুমোদিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
  • জমিতে যথাযথ উর্বরতা এবং রস সংরক্ষণ করতে হবে।
  • আখ কাটার পর মোথাসমেত সমস্ত মরা মাতা পুড়িয়ে ফেলতে হবে ও প্রখর রোদ্র দ্বারা আক্রান্ত জমির মাটি শুকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে অটোস্টিন বা নোইন নামক ছত্রাক নাশক মিশিয়ে রোপনের আগে ৩০ মিনিট ধরে বীজ শোধন করে নিন।

আখের পাতার লাল ডোরা দাগ/ডগা পচা রোগ

এটি (Pseudomonas sp.) ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ।

লক্ষণ

  • আখের পাতার শিরা বরাবর লম্বা, সরু, লাল বা গাঢ় লাল রঙের টানাটানা দাগ দেখা যায়।
  • প্রথমে দাগগুলো আলাদা আলাদা থাকে। পরে একত্র হয়ে বিস্তৃত হয় ও পাতার অনেকাংশ জুড়ে দেখা যায়।
  • পাতার ঠিক নিচের কচি বাড়ন্ত কান্ডে পচন ধরে, এত ডগার পাতা মরে যায় ও ডগার অংশ ভেঙ্গে পড়ে।
  • আক্রান্ত ডগা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত ব্যবহার করা।
  • রোগমুক্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ করা।
  • রোগাক্রান্ত গাছ পুড়ে নষ্ট করা।

আখের লাল পচা রোগ

এটি (Colletotrichum falcatum) ছত্রাকজনিত রোগ।

লক্ষণ

  • আক্রান্ত আখ লম্বালম্বি ভাবে চিড়লে লাল রঙের মাঝে আড়াআড়ি সাদা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।
  • আখের কান্ড পচে যায়।
  • পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে যায়।
  • আখের কান্ড শুকিয়ে মাঝখানে ফাপা হয়, আখ মারা যায়।
  • আক্রান্ত আখ হতে মদ বা তাড়ির মতো দুর্গন্ধ বের হয়।
  • কচি কুশিতে আক্রমণ হলে কুশির মড়ক দেখা যায়।

সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

  • অনুমোদিত ও রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করা।
  • রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করা।
  • রোগাক্রান্ত ক্ষেত হতে বীজ সংগ্রহ না করা।
  • মুড়ি আখের চাষ না করা।
  • আখের জমিতে পানি নিষ্কাশনের সু-ব্যবস্থা করা।
  • বীজ বপনের পূর্বে অপোস্টিন নামক ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করা ( ৪১ ভাগ অটোস্টিন এবং ১০০০ ভাগ পানি)।
  • ফসল কাটার পর ক্ষেতের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে নষ্ট করা।

আখের পোকা ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনা

আখের কান্ডের মাজরা পোকা

লক্ষণ

  • প্রাথমিক অবস্থায় গাছের পাতাগুলো শুকাতে থাকে এবং পরিণতিতে আখের মাথা বা উপরিভাগ মরে যায়।
  • কখোনো আক্রান্ত গাছের মাথা সহজেই ভেঙ্গে যায়।
  • দ্বিতীয় পর্যায়ে আক্রমণে কান্ডের গায়ে অসংখ্য ছিদ্র থাকে এবং ছিদ্রের গায়ে গুড়ার মত ময়লা এবং কীড়ার মল দেখা যায়।
  • আক্রান্ত গাছ কখনও কখনও শিকড় গজায় এবং আখের কান্ড জড়িয়ে ফেলে এবং আনেক ক্ষেত্রে চোখ গজিয়ে গাছ বের হয়।

ব্যবস্থাপনা

  • আক্রান্ত গাছ পোকাসহ তুলে ধ্বংস করা।
  • পোকামুক্ত বীজখন্ড রোপণ করা।
  • পুরনো শুকানো পাতগুলো গাছ থেকে ছড়িয়ে ফেলা ও আগাম কর্তন অনুসরণ করা।
  • জমি আগাছামুক্ত রাখা।
  • কর্তনের পর মোথাগুলো চাষ দিয়ে কোদাল দিয়ে তুলে পুড়িয়ে ধ্বংস করা। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি হেক্টর জমিতে কার্বোফুরান ৫ জি ৪০ কেজি হারে প্রয়োগ করা।

সাবধানতা

১। একই জমিতে পরপর আখ চাষ করবেন না।

২। গমের জমির পাশে বা গমের সঙ্গে আখ চাষ পরিহার করা।

আখের উঁইপোকা

লক্ষণ

  • রোপনকৃত বীজ খন্ড খেয়ে ফেলায় গাছ গজাতে পারে না।
  • আখ দাঁড়ানো অবস্থায়ও এরা আখের মূল শিকড় ও কান্ড খেয়ে ক্ষতি করে এবং গাছ মরে যায়।

ব্যবস্থাপনা

  • রানীসহ উঁইপোকার দল ধ্বংস করা।
  • আঁকাবাঁকা পদ্ধতিতে সেট রোপন করা।
  • খাদ্য ফাঁদ ব্যবহার করা (মাটির হাড়িতে পাট কাঠি, ধৈঞ্চা রেখে জমিতে পুতে রেখে পরে তুলে উঁইপোকাগুলো মেরে ফেলা)।
  • সেচ দিয়ে কয়েকদিন পানি ধরে রাখা।
  • রিজেন্ট ৩ জিআর ৩৩.০ কেজি/হে., নালায় সেট বসানোর পর ছিটিয়ে প্রয়োগ করা এবং যথাশীঘ্র সেট ও কীটনাশক মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া । মাটিতে জোঁ থাকা বাঞ্চনীয়।

আখের জাবপোকা বা এফিড

লক্ষণ

  • পিপিলিকার উপস্থিতি এ পোকার উপস্থিতিকে অনেক ক্ষেত্রে জানান দেয়।
  • এরা পাতা ও কান্ডের রস চুষে খায়।
  • এর আক্রমন বেশি হলে শুটি মোল্ড ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে এবং গাছ মরে যায়।

ব্যবস্থাপনা

  • হাত দিয়ে পিশে পোকা মেরে ফেলা।
  • আক্রান্ত পাতা অপসারণ করা।
  • পরভোজী পোকা যেমন: লেডিবার্ডবিটল লালন।
  • ডিটারজেন্ট পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
  • প্রতি গাছে ৫০টির বেশি পোকার আক্রমণ হলে এডমেয়ার ০.৫ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করা।

তথ্যসূত্র: কৃষিকথা, বিএসআরআই ওয়েবসাইট, ইন্টারনেট plant disease clinic BAU

গোলাম আরিফ, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, পাবনা।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন